লাভ ম্যারেজ
‘বলো মা, কবুল!’
এইসহ তিনবার এক কথা বলেছেন বিয়ের কাজী। অথচ ফাজিহা সেটাকে পাত্তাই দিচ্ছেনা। সে রাগে দুঃখে কান্না করছে তখন থেকে। এইভাবে ধোঁকা দিয়ে দিল সবাই ওকে? শেষে নিজের বান্ধবী টাও? এভাবে ঠকে গেল সে? নিজের উপর ও রাগ হচ্ছে ওর। ওর স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে অথচ ওর তেমন কষ্ট কেন হচ্ছেনা? নিজেকেই নিজে বুঝতে পারছেনা সে।
পালিয়ে যাওয়ার নাম করে রুবাইয়া ফাজিহা কে নিয়ে যখন কমিউনিটি সেন্টারে এসেছিল তখনই ফাজিহার সন্দেহ হয়েছিল। ভেতরে আসতেই চায়নি। রুবাইয়া জোর করে নিয়ে এসেছে। এখানে নাকি কে একজন সাহায্য করবে তাদের। কিন্তু ভেতরে এসেই পরিচিত মুখগুলোকে দেখে ফাজিহার যা বোঝার বোঝা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। নতুন বউকে দেখার জন্য চারদিক থেকে মানুষ ঘিরে ধরেছে! ফাজিহার কাজিনরা আর রুবাইয়া ওকে বউয়ের আসনে নিয়ে বসাল। ফাজিহা স্তব্ধ! নির্বাক! রুবাইয়ার দিকে রেগে তাকাতেই ভেঙচি দিল সে।
তখন থেকেই কাঁদছে ফাজিহা। সবাই ভাবছে, আহারে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে কত কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা। কাজী ও সেটাই ভেবেছিল। কিন্তু এখন মহাবিরক্ত তিনি। এ কেমন মেয়েরে বাবা!
হঠাৎ মাথায় কারোর স্পর্শ পেতেই সেদিকে তাকাল ফাজিহা। তাকিয়ে দেখল মিজানুর রহমান। মেয়ের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বললেন,
‘বাবার মান সম্মান টা রাখ মা! আর কখনো কিছুই চাইবোনা তোর কাছ থেকে। বিশ্বাস রাখ বাবার উপর; তুই অনেক ভালো থাকবি।’
ফাজিহার মন গললোনা বাবার কথায়। উল্টো তীব্র অভিমানে ঝেঁকে ধরলো। মাথার উপর থেকে মিজানুর রহমানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে অভিমানী কন্ঠে বলে উঠলো,
‘কবুল, কবুল, কবুল।’
চারদিক থেকে আলহামদুলিল্লাহ ধ্বনি বেজে উঠলো৷ কাজী সাহেব চলে গেলেন৷ ফাজিহাকে এখন স্টেজে নিয়ে যাওয়া হবে; বসানো হবে ভদ্রের পাশাপাশি।
ভদ্রের পাশে বসাতেই ক্যামেরাম্যান ফটোগ্রাফি শুরু করে দিল দুজনের। লোকজন এসে জড়ো হয়ে ছবি তুলছে বর-কনের৷ ভদ্র তাকিয়ে দেখল একবার ফাজিহার দিকে। রোজ গোল্ড মিশ্রিত ডিপ ক্রিমসন লাল রঙের শাড়িতে পরীর মতো লাগছে ফাজিহা কে। তারউপর কান্নার ফলে নাকের ডগা লালচে হয়ে আছে কেমন! ভীষণ আদুরে লাগছে দেখতে। কিন্তু ফাজিহা তাকিয়েছে কিনা বোঝার উপায় নেই। ভদ্রের মনে হয়েছে তাকিয়েছে একবার; পরক্ষণেই বুঝ দিল নিজেকে এখন যা রেগে আছে তাকাবে বলে ভাবাটাই ভুল। কি ভাগ্য ভদ্রের বর সেজে যার জন্য আসলো সেই তাকাচ্ছে না একবার! মনে মনে আপসোস হলো। সামনের টিস্যু বক্স টা থেকে একটা টিস্যু নিয়ে এগিয়ে দিল ফাজিহার দিকে। তারপর ফিসফিস করে বললো,
‘চ্যালেঞ্জ তবেই জিতেই গেলাম! কিছুই করতে পারলে না?’
ফাজিহা রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে টিস্যু টা দিয়ে নাক মুছে ভদ্রের হাতে ধরিয়ে দিল। ভদ্র সঙ্গে সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দিল সেটা। দাঁতে দাঁত চেপে ফাজিহাকে বললো,
‘ভালো করলেনা, দেখে নিব তোমাকে!’
‘আপনি কি দেখে নিবেন আমায়.? আমিই আপনাকে দেখে নিব! আমাকে বিয়ে করার ফল ভালোভাবে টের পাওয়াবো মিস্টার অভদ্র!’
‘কে কি টের পাওয়ায় সেটা তো পরে দেখা যাবে মিস ফাজিল..ওহ্ স্যরি মিসেস ফাজিল! আপাতত সামনের দিকে তাকাও নাহলে সবাই আবার খারাপ কিছু ভাবতে পারে।’
‘খারাপ ভাববে মানে?’
‘মানে ভাববে তর সইছে না আমাদের; বিয়ে হতে না হতেই সবার সামনে ফিসফিস করা শুরু করে দিয়েছি।’
‘তাতে আমার কি?’
‘তাতে তোমার কিছু না হলেও অন্তত ছবিতে সুন্দর দেখানোর জন্য ঝগড়া বাদ দিয়ে সামনে তাকাও ফাজিল মেয়ে!’
‘অভদ্র!’
দাঁত কিড়মিড় করে তাকিয়ে বললো ফাজিহা৷ তারপর না চাইতেও ক্যামেরার দিকে তাকাল। ওই অভদ্রের জন্য ওর ছবি খারাপ আসতে তো দেওয়া যায় না। কত কত ছবি তোলার শখ ছিল ওর। কথায় কথায় যে কখন কান্নারত মুখটা বদলে গেছে সেও হয়তো টের পায়নি৷ কিন্তু ভদ্র ঠিকই লক্ষ্য করল। মৃদু হাসল সে!
খাওয়ার সময়টাতেও ফাজিহা প্রতি কথায় ভদ্রের সাথে তর্ক করলো। ভদ্র ও কম যায়না। সেও ছাড় দিবে নাকি? দুজনের ঝগড়া কেউ না টের পেলেও ওদের সাথে বসা শুভ আর রুবাইয়া ঠিক ই টের পেল। টম এন্ড জেরির ভবিষ্যৎ সংসার কেমন হবে তা ভেবে চোখাচোখি হাসলো দুজনে। হাসির মাঝেই হঠাৎ করে চোখ টিপে দিল শুভ!রুবাইয়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
সবশেষে বিদায় পালা চলেই এলো। ফাজিহার অস্থির লাগছে। তার মানে সকালেই তার চির আপন ঠিকানাটা ছেড়ে এসেছিলো? ওই জন্যই হয়তো নাজিয়া রহমান কান্না করেছিল। ভদ্রের মা আতিফা চৌধুরী সান্ত্বনা দিচ্ছেন নাজিয়া রহমানকে। একেবারেই ভেঙে পড়েছেন তিনি। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন। ফাজিহাও আর আটকে রাখতে পারলোনা। মা মেয়ের কান্না যেন শেষ ই হচ্ছেনা। এক পর্যায়ে নাজিয়া রহমান অজ্ঞান হয়ে গেলেন। সবাই মিলে ওনাকে একপাশে নিয়ে শুইয়ে দিলেন। ফাজিহা পারলোনা যেতে৷ তাকে তো এখন তার নতুন ঠিকানায় যেতে হবে। মিজানুর রহমান একপাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন। মেয়ের কাছে আসামাত্রই ফাজিহা বাবাকে দেখে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো। অনবরত কান্না করতেই থাকলো। দুঃখে হয়তো সে এখন সব অভিমান ভুলে গেছে৷ মিজানুর রহমানও চোখ মুছে নিলেন নিজের। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ভদ্রকে বললেন,
‘আমার মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছি! খেয়াল রেখো ওর। কষ্ট যেন না ছুঁতে পারে ওকে।’
ভদ্র মাথা নাড়িয়ে বললো,
‘আপনি চিন্তা করবেন না। ওর কোনো অসুবিধা হতে দিবনা আমি।’
গাড়িতে উঠার আগে রুবাইয়া এসে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘প্লিজ ভুল বুঝিস না আমায়!’
ফাজিহার অভিমান কাজ করছিল না তখন। সেও দেখালো না রাগ। শুধু অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিল।
অতঃপর? অতঃপর আরকি? হয়ে গেল বিদায়। সারাটা পথ কান্না করেছে ফাজিহা। ভদ্র সান্ত্বনা দিতে গেলেই হঠাৎ করে ভদ্রের বুকে ঝাপিয়ে পড়ল। ভদ্র বুঝল ফাজিহা হুঁশে নেই। তাই সেও যথাসাধ্য চেষ্টা করল ফাজিহাকে সান্ত্বনা দেওয়ার। কান্না করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ফাজিহা ঘুমিয়ে পড়লো ভদ্রের বুকের মাঝেই। ভদ্র একহাতে আগলে নিল তাকে। ভাবা যায়? এটাই সে দস্যি মেয়ে? ফাইজাও এসেছে ফাজিহার সাথে। তার ও কান্না পাচ্ছে বোনের এত কান্না দেখে। এখনো সাথে আছে তাই হয়তো সে দুঃখ টা ঠিক বুঝেনি। যখন দূরে হয়ে যাবে তখন হয়তে বুঝবে।
সেন্টার টা ভদ্রদের বাড়িটা বেশ দূরে হওয়ায় এসে পৌঁছাতে ঘন্টাখানেক সময় লেগে গেল৷ হঠাৎ গাড়ি ব্রেক কষায় ঘুম ছুটে গেল ফাজিহার। মস্তিষ্কে ঘুমের রেশটা রয়ে গেছে এখনো। ফাইজাকে নিয়ে শুভ ভেতরে চলে গিয়েছে। ভদ্রও নেমে একপাশে দাড়ালো ফাজিহার জন্য। ফাজিহা শাড়িটা ঠিক করে নিল। নামতে গেলেই শরীর হেলে উঠলো ওর। ভদ্র ধরে নামালো। ভদ্রের দিকে তাকাতেই ফাজিহার ঘুমের রেশ কেটে গেল। হুঁশও ফিরলো সাথে। ধাক্কা দিয়ে ভদ্রের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।
‘বিয়ে হতে না হতেই ছোঁয়াছুঁয়ি শুরু হয়ে গেছে আপনার?’
‘নিজেই হেলে পড়ে যাচ্ছিলে তাই ধরেছি নাহলে ঠ্যকা পড়েছে নাকি আমার?’
‘আমি কি বলেছি আপনাকে ধরতে? যত্তসব গায়ে পড়া লোক!’
‘আমি গায়ে পড়া হলে তুমি কি?’
‘আমি কখন আপনার গায়ে পড়েছি এমন?’
‘ওহ্ আচ্ছা সারাপথ কে যেন একটা আমার বুকে মাথা রেখে কান্না করলো তারপর আবার সেখানেই ঘুমালো! কে ছিল সেটা? তুমি চিনো তাকে?’
ফাজিহার দম ফুরিয়ে গেল। বজ্জাত লোক একটা! সে মেকি রাগ দেখিয়ে ভদ্রকে রেখে সামনের দিকে হাঁটা দিল। ভদ্রও হেসে ফাজিহার পিছু পিছু বাড়ির ভেতরে গেল। ওদের দরজা থেকে আতিফা চৌধুরী আর ভদ্রপর ফুপিরা এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ভদ্রদের বাড়িতে এখন আর তেমন অতিথি নেই। শুধুমাত্র ভদ্রের ফুপিরা দুইজন আছে। ভদ্রের বাবা রাজীব চৌধুরীর বোনদের যথেষ্ট ভালোবাসে। তাই এ বাড়িতে তাদের কর্তৃত্ব চলে বেশ। আতিফা চৌধুরীও ননদদের ভালোবেসে মান্য করে চলে।
ভদ্রের বড় ফুপি রাজিয়া ফাজিহাকে একটা রুমে নিয়ে গিয়ে সুতির শাড়ি দিল একটা। উনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন ভারী শাড়িতে ফাজিহার অসুবিধা হচ্ছে। ফাজিহা বাধ্য মেয়ের মতো ওয়াশরুমে গিয়ে বদলে নিল শাড়িটা। ওকে আপাতত গেস্ট রুমটা দেওয়া হয়েছে। রাতে নিয়ে যাওয়া হবে ভদ্রের রুমে। বড় ফুপি যাওয়ার আগে ফাজিহা কে একটু ঘুমিয়ে নিতে বলে গেছেন একটু পর নাকি অনেকেই আসবে ওকে দেখতে। ফাজিহা মুগ্ধ এখানকার সবার আচরণ দেখে। ভদ্রের দুই ফুফাতো বোন রাইসা আর তিশাকে ও অনেক মিশুক প্রকৃতির মনে হয়েছে ফাজিহার কাছে। এ বাড়িতে আসার আগ থেকে সেই বিয়ের সময় থেকে ফাজিহার পিছু পিছু থেকেছে। সবাইকে খুব ভালো লেগেছে ফাজিহার শুধু ওই অভদ্রটা কে ছাড়া।
ভাবতে ভাবতে হাই তুললো ফাজিহা। তার আপাতত ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ফাইজা টা কোথায় কে জানে? হয়তো ছোটো কারোর সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলেছে। দরজাটা হালকা ভেজিয়ে দিয়ে ফাজিহা শুয়ে পড়লো চোখ বন্ধ করে।
সব পর্বের তালিকা