লাভ ম্যারেজ
আঁধারের ইতি ঘটিয়ে সূ্র্য্যি মামার দেখা মিলেছে অনেকক্ষণ হলো। পুবের আকাশে কড়া তেজ নিয়ে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করাচ্ছে সে।
ফাজিহাদের বাড়িতে আপাতত কোনো শোরগোল নেই। অনেক রাত করে শেষ হয়েছে অনুষ্ঠান! তাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে বেশিরভাগই। অনেকেই অবশ্য উঠে পড়েছে। শুধু ফাজিহা ব্যতিক্রম। না সে উঠেছে আর না ঘুমিয়েছে! সারারাত বিছানার এপাশ ওপাশ করেছে কেবল! কেন জানিনা মনটা কেমন লাগছিল তার৷ সে আজ যেটা করবে তাতে তার বাবার সম্মান তো নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর বাবা কি আর ওকে ক্ষমা করবে? আর সেটা না করলে তার এতোদিনের স্বপ্ন ও শেষ হয়ে যাবে৷ সবকিছুর উর্ধ্বে তার বারবার মনে পড়ছে ভদ্রের কথা! কিন্তু কেন? নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পেল না সে। আজকে বিয়েটা না হলে তার খুশি হওয়ার কথা অথচ পারছেনা সে খুশি হতে!
বিষন্ন মনে সব গোছগাছ করে নিল পার্লারে যাওয়ার জন্য। সব তো ঠিক হয়েই আছে এখন আর পিছুপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পার্লারে গিয়েই যা করার করবে।
নাজিয়া বেগম তাড়া দিয়ে গেছেন গোসল করার জন্য। তাই কাপড় নিয়ে গোসল করতে ঢুকল সে। রুবাইয়া ও ঘুম থেকে উঠে গেছে। সেও যাবে ফাজিহার সাথে পার্লারে। ফাজিহার আর কোনো সমবয়সী কাজিন ও নেই যে যাবে।
রুবাইয়া উঠেই চুলগুলো পেচিয়ে নিল কোনোমতে। ফাজিহা বেরোলেই সে ঢুকবে। তারপর আবার চুল শুকানোর ব্যপার আছে! আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিচ্ছবির পাশাপাশি আরো কিছু নজরে এলো তার! মুহুর্তেই রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল সমস্ত মুখ! হাত টা সামনে এনে দেখল কিছুক্ষণ। সিলভার গোল্ড এর পাতলা বেসের মাঝখানে ছোট্ট মুক্ত বসানো একটা রিং! কাল রাতে দিয়েছিল শুভ। গতকাল রাতের কথা মনে পড়তেই রুবাইয়া মৃদু হাসলো। গতকাল রাতে…
‘প্লিজ রুবাইয়া রেসপন্স করুন! ইয়েস অর নো!’
রুবাইয়া কি বলবে? গলা দিয়ে তো কোনো স্বর-ই বের হতে চাইছেনা তার। মন তো সে দিয়েই ফেলেছে। কিন্তু প্রকাশ করবে কিভাবে? নারীসুলভ লাজুকলতা যে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রুবাইয়ার থেকে কোনো রেসপন্স না পেয়ে শুভ মন খারাপ হলো কিছুটা৷ মন খারাপেরা তারও বাকরুদ্ধ করলো। হয়তো রুবাইয়ার দিক থেকে কিছুই নেই। সেই ভুল করেছে! মাথা নিচু করে রুবাইয়াকে বলল,
‘আ'ম স্যরি রুবাইয়া। আমি বুঝতে পারিনি! আপনি কিছু মনে করবেন না।’
‘ইয়েস! আই উইল!’
অনেক কষ্টে কথাটা বলে উঠলো রুবাইয়া। শুভ অবাক নজরে তাকাল। তার মানে রুবাইয়াও ভালোবাসে তাকে? পাগলের মতোন আবার জিজ্ঞেস করল,
‘প্লিজ সে ওয়ানস্ মোর! প্লিজ আরেকবার!’
‘ইয়েস! ইয়েস!’
দম বন্ধ করে পরপর দু'বার বললো রুবাইয়া। কিন্ত তাকে দম ফেলার সুযোগ না দিয়েই মুহুর্তেই ঝাপটে জড়িয়ে ধরল শুভ! স্তব্ধ হলো রুবাইয়া। নড়াচড়ার শক্তি টুকু পর্যন্ত হারিয়ে বসল শেষে।
রুবাইয়াকে ছেড়ে শুভ পকেট হাতড়ে একটা বাক্স বের করলো। তারপর বাক্সটা খুলে একটা রিং পরিয়ে দিল রুবাইয়ার হাতে! সেদিন কেনাকাটার সময় ভদ্রের সাথে সেও একটা রিং কিনেছিল। আজকে সপটা দেওয়ার সুযোগ ও পেয়ে গেল। রিংটার দিকে একবার চেয়ে রুবাইয়া দৌড়ে চলে এলো সেখান থেকে। শুভ হাসল লাজুক রমনীর কান্ডে!
বর্তমান,,,
এসব ভাবতে ভাবতে রুবাইয়া অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। ধ্যান ভাঙলো ওয়াশরুমের দরজা খোলার আওয়াজে। রুবাইয়া তাড়াতাড়ি করে আংটিটা খুলে লুকিয়ে ফেললো। ফাজিহা দেখলে কেলেংকারী বাঁধাবে।
গাড়ি এসে গেছে ফাজিহা কে পার্লারে নেওয়ার জন্য।
ফাজিহা তৈরি হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছে বাহিরের দিকটা। হঠাৎ ওর কাছে অস্বাভাবিক লাগলো সব! বিয়ে বাড়ির গমগমে পরিবেশ টা নেই। বাবুর্চিদের রান্নার কাজ ও চলছেনা। বারান্দা থেকে বের হয়ে সে নিচে নামলো। নাহ! ঘরের কারোর মাঝেও বরপক্ষ কে আপ্যায়নের কোনো তোড়জোড় নেই.।
ফাজিহার পেছন পেছন রুবাইয়া ও এলো। সেও তৈরি হয়ে গেছে।
‘আজ বাড়িতে বিয়ে অথচ কোনো তোড়জোড় নেই কেন?’
‘মানে?’
আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো রুবাইয়া।
‘মানে বাড়িতে বিয়ে অথচ বাইরে রান্নার কোনো তোড়জোড় নেই। বরপক্ষ আমন্ত্রণের কোনো প্রস্তুতি নেই! এত শান্ত কেন সব?’
‘রান্নাটা বাড়ির পিছনের বাগানে গহচ্ছে আম্মু! আর রাত করে ঘুমানোয় সবাই ক্লান্ত। আস্তে ধীরে সব শুরু হবে।’
নাস্তার প্লেট হাতে নাজিয়া রহমান এসে কথাটা বললেন। রুবাইয়া হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। আরেকটু হলে তো ঠিক ধরে ফেলত এক্ষুনি। নাজিয়া রহমান নাস্তার প্লেট একহাতে নিয়ে আরেক হাতে ফাজিহাকে সহ টেনে সোফায় বসলেন। চোখ ভর্তি জল টইটম্বুর করছে উনার। মেয়েকে আর কবে আদর করে খাইয়ে দিতে পারবেন কে জানে? নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন মেয়েকে। ফাজিহাও বাধ্য মেয়ের মতো খেয়ে নিল। রুবাইয়া একটু আগে নিচে নেমে নাস্তা করে গিয়েছিল। তবে এখন ফাজিহা খাইয়ে দেওয়া হচ্ছে দেখে তারও লোভ লাগছে! নাজিয়া রহমান রুবাইয়া তাকিয়ে থাকতে দেখে বললেন,
‘মহারানী কে ডেকে খাওয়াতে হবে?’
এটার ই তো অপেক্ষায় ছিলো রুবাইয়া। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে বসলো নাজিয়া রহমানের পাশে। নাজিয়া রহমান একটুকরো রুটি ছিড়ে রুবাইয়াকে খাইয়ে দিলেন। আবার ফাজিহাকে একটুকরো খাওয়ালেন। ফাইজা বোনের সাথে পার্লারে যাওয়ার বায়না ধরতে এসে এই দৃশ্য দেখে সেও এসে আবদার জুড়ে বসলো,
’আমাকেও খাইয়ে দাও আম্মু। আমিও তো আজ আপুর সাথে ওর শ্বশুরবাড়িতে যাব।’
ওর কথা শুনে হেসে দিল সবাই। নাজিয়া রহমান এক এক করে তিনজনকেই খাইয়ে দিলেন।
খাওয়া শেষে ফাজিহা পার্লারে যাওয়ার জন্য তাড়া দিল রুবাইয়া। গাড়ি এসেছে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। এখন বেরুতে হবে। ফাজিহা বেরুনোর সময় নাজিয়া রহমান মেয়েকে ধরে কান্না করে দিলেন। ফাজিহা অবাক হলো। এখন তো সে পার্লারে যাচ্ছে ; বাড়িতে যে ফিরবেনা সেটা তো নাজিয়া রহমান জানেনা। তাহলে কাঁদছে কেন? মিজানুর রহমানের চোখেও জলের আবছা! সবকিছুই অন্যরকম লাগছে তার! কৌতুহল নিয়ে আরেকবার বাড়ির দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো সে।
একে একে পেরিয়ে গেল পরিচিত সব মুখ, পরিচিত সব জায়গা গুলো।
পার্লারে সাজ শেষ হতে বেলা একটা বাজল।
পরিকল্পনা মাফিক এখান থেকেই পালাবে ফাজিহা আর সাহায্য করবে রুবাইয়া। ওদের নেওয়ার জন্য যেই গাড়িটা আসার কথা ছিল সেটাকে আরো এক ঘন্টা পরে আসার জন্য ফোন করে বলে দিল রুবাইয়া।
রুবাইয়া আগে থেকেই গাড়ি ঠিক করে রেখেছে। দুজনে সেটাতে করে চলে যাবে। রুবাইয়া যদি না যায় তাহলে ফাজিহা চলে যাওয়ার কারণে রুবাইয়াকে দোষারোপ করবে সবাই। এর চেয়ে পরে ফাজিহা সবাইকে সব বুঝিয়ে বলবে।
এই সবকিছুই রুবাইয়ার প্ল্যান!
‘কিরে কখন বেরবো এখান থেকে? কাকে কল করে যাচ্ছিস তখন থেকে?’
ফাজিহার গলা পেয়ে রুবাইয়া কেটে দিল কলটা। চোরা হেসে বললো,
‘নাহ্ কাউকে না। তুই গিয়ে গাড়িতে বস, আসছি আমি।’
ফাজিহা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেল গাড়ির দিকে। রুবাইয়া আবার কল দিল কাউকে। এবার ওপাশ থেকে রিসিভ হলো কলটা। রুবাইয়া আস্তে আস্তে করে বললো,
‘আমরা বের হচ্ছি! সব ঠিকঠাক ভাবেই হচ্ছে।’
‘ওকে গুড!’
তারপর ফোনটা রেখে দিয়ে রুবাইয়াও গিয়ে বসলো ফাজিহার সাথে। রওনা হলো কোনো এক বিশেষ জায়গার উদ্দেশ্যে।
সব পর্বের তালিকা